আনুপাতিক নির্বাচন কী ও এর বিস্তারিত

বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রায় ৭ ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে দুটি নির্বাচন ব্যবস্থার প্রচলন সবচেয়ে বেশি।

একটি হলো, ফার্স্ট পাস্ট দ্যা পোস্ট (First past the post) এবং আরেকটি

প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (Proportional Representation) ।

বাংলাদেশে যে ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে সেটি মূলত ফার্স্ট পাস্ট দ্যা পোস্ট পদ্ধতি। একে ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতিও বলা হয়। ওয়েস্টমিনিস্টার কথাটি এসেছে লন্ডনের প্যালেস অফ ওয়েস্টমিনস্টার থেকে। এখানেই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অবস্থিত। মূলত ব্রিটেনের নির্বাচনে ব্যবস্থাকেই ওয়েস্ট মিনিস্টার সিস্টেম বলা হয়। কমন ওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে অর্থাৎ অতীতে যে সমস্ত দেশ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল, সেসব দেশে ওয়েস্টমিনিস্টার ব্যবস্থার নির্বাচন দেখা যায়। এই পদ্ধতিতে একটি নির্বাচনী এলাকা আসনে একাধিক দলের মনোনীত প্রার্থী অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকে। একটি আসনে যে ব্যক্তি বেশি ভোট পায় তিনি ওই আসনে নির্বাচিত হন। এভাবে সারা দেশে যে দল সবচেয়ে বেশি আসন লাভ করে সেই দল সরকার গঠন করে। প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতিতে কোনো নির্বাচনী এলাকা বা আসনে প্রার্থীদের মধ্যে কোনও ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় না। কারণ আসন ভিত্তিক কোনও প্রার্থীই থাকে না। এমনকি ব্যালটে কোনও প্রার্থীর নামও থাকে না। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র দলীয় প্রতীকে ভোট গ্রহণ হয়। একটি দল সারা দেশে যত শতাংশ ভোট পায়, সেই অনুযায়ী জাতীয় সংসদের আসন বণ্টন হয়। মনে করুন, সারা দেশের নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী

“ক” লীগ পেয়েছে ৬০% ভোট,

“খ” দল পেয়েছে ৩০% ভোট  এবং

“গ” পার্টি ১০% ভোট।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে যেহেতু আসন সংখ্যা তিনশ টি তা হলে ভোটের আনুপাতিক হারে “ক” লীগ পাবে ১৮০ টি আসন,

“খ” দল পাবে ৯০ টি আসন এবং

“গ”  পার্টি পাবে ৩০ টি আসন।

সেক্ষেত্রে “ক” লীগ সরকার গঠন করবে এবং “খ” দল ও “গ” পার্টি হবে বিরোধী দল। তার মানে সারা দেশে ভোটের ফলাফলের আনুপাতিক হারে পার্লামেন্টের আসন বন্টনের পদ্ধতিকেই প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা আনুপাতিক নির্বাচন বলা হয়।

 

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০ টি আসন আনুপাতিক পদ্ধতিতেই বণ্টন করা হয়। আনুপাতিক নির্বাচন আবার তিন ধরনের হয়ে থাকে।

মুক্ত তালিকা

বদ্ধ তালিকা

মিশ্র পদ্ধতি

মুক্ত তালিকায় নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলগুলো তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর দলের প্রার্থী তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নামের ক্রমানুসারে আসন বণ্টন করা হয়।

বদ্ধ পদ্ধতিতে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয় না আর

মিশ্র পদ্ধতিতে কিছু আসনে আনুপাতিক ও কিছু আসনে ওয়েস্টমিনিস্টার ধাঁচের আসন ভিত্তিক নির্বাচন হয়।

 

আবার কোনো কোনো দেশে দ্বি কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট থাকায় এক কক্ষে আনুপাতিক নির্বাচন এবং অন্য কক্ষে আসন ভিত্তিক নির্বাচন হয়।

 

বাংলাদেশের প্রচলিত ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতিতে একটি দল সারা দেশে কত ভোট পেল সেটি দেখা হয়না। কোন দল কত আসন পেল সেটাই মূখ্য বিষয়। মনে করুন বর্তমানে প্রচলিত ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির নির্বাচনে “ক” দল সারা দেশে মাত্র ৩০% ভোট পেয়েও অধিক আসন লাভ করেছে এবং “খ” লীগ“গ” পার্টি সম্মিলিতভাবে দেশের প্রায় ৭০% ভোট পেয়েও কম আসন লাভ করেছে, সে ক্ষেত্রে কম ভোট পেয়েও “ক” দল সরকার গঠন করবে এবং “খ” লীগ ও “গ” পার্টি একসাথে দেশের অধিক ভোট পেয়েও হয়তো সংসদে যেতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে দেশের অধিকাংশ লোকের ভোটের কোনও মূল্যই থাকল না। কিন্তু আনুপাতিক পদ্ধতিতে যে দল যত ভোট পাবে তারা তত শতাংশ আসনে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। এক্ষেত্রে দেশের মানুষের ভোটের রায় বৃথা যাবে না। প্রচলিত ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতিতে আসন ভিত্তিক নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের প্রতিফলন হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মনে করুন, একটি আসনে “ক” লীগ প্রার্থী পেয়েছে ৩৫ টি ভোট। “খ” দল প্রার্থী পেয়েছে ৪০ টি ভোট এবং “গ” পার্টি পেয়েছে ২৫ টি ভোট। তার মানে এখানে খ দল প্রার্থী জয়ী হয়েছে। কারণ, সে বেশি ভোট পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই আসনে মাত্র ৪০ জন লোক তাঁর পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু অন্যান্য দলের ভোট মিলিয়ে ৬০ জন লোক তাঁর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। অর্থাৎ বেশিরভাগ মানুষের ভোটে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও বর্তমান পদ্ধতিতে সংসদ সদস্য হওয়া যায়। কিন্তু আনুপাতিক পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয় এবং সেই সাথে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সুযোগ থাকে। তাছাড়া বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় কোনও আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে ভোট ছাড়াই একক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

 

বাংলাদেশে প্রচলিত ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির নির্বাচনের চেয়ে আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা সকল দিক থেকেই সুবিধাজনক এবং এই উপায়েই সবচেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা যায়। বাংলাদেশে মাত্র ৫০ বছর ধরে ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতি চালু রয়েছে। কিন্তু যে ব্রিটেনে এই পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে এবং মধ্যযুগ থেকে কয়েকশ বছর ধরে সেখানে ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির নির্বাচন চলে আসলেও খোদ যুক্তরাজ্যেই এই পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের নির্বাচনেই ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতিতে জনগণের ভোটের প্রকৃত ফলাফল উঠে আসছে না বলে দেশটিতে আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণ করার বিষয়ে বিতর্ক চলছে। তার মানে যারা এই পদ্ধতির আবিষ্কারক তারাই যদি এর সংস্কৃতির ধার না ধেরে নতুন কার্যকর পদ্ধতির দিকে যেতে চাইতে পারে সেখানে আমরা কেন সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে অ-কার্যকর একটি পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে থাকব।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ