যেভাবে শুরু হয়েছিলো উপজাতি-বাঙালি সংঘাত!

বাংলাদেশের ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল যেন এক স্বর্গরাজ্য।  কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বর্গরাজ্যে হঠাৎ আগুনের ফুলকি গোলাগুলির মত সব ঘটনা। সেনাবাহিনীদের উপর আক্রমণ, আদিবাসীদের ঘরবাড়িতে আগুন, আদিবাসী বাঙালিদের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা, দোকান ও মসজিদে আগুনসহ সব ঘটনায় অশান্ত বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? এ ঘটনায় আসলে দোষী কারা? এই ঘটনার উৎপত্তি কবে কোথায় কিভাবে শুরু হয়েছিল। “এখানে পাহাড় থেকে সেনাশাসন তুলে নাও এরপরে বাঙালিদের তুলে নাও আমাদের পাহাড় লাগবে”। “আমি কেন বাঙালি হতে যাব? বাংলাদেশের সবাই বাঙালি মানে? এটা আপনি কিভাবে বললেন বাংলাদেশের সবাই বাঙালী”। “আমি আদিবাসী আমি বাংলাদেশী, কোনভাবেই আমরা বাঙালি হতে পারি না”।  কথাগুলো ইদানিং সোস্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন ও জটিল। রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এই তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্রময় এবং প্রভাবশালী। এ অঞ্চলের ইতিহাসে বিভিন্ন শক্তির আধিপত্য স্থানীয় আদিবাসীদের অধিকার এবং বৈদেশিক আগ্রাসনের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।  পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাসে আরাকান রাজা শাসনের কথা উল্লেখযোগ্য।  ১২৪০ সালে ত্রিপুরা রাজা শাসনামল এবং ১৫৭৫ সালে পুনরায় আরাকান রাজার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।  ১৬৬৬ সালে মোঘলরা এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে এবং ১৮৬০ সালে ব্রিটিশরা এটি দখল করে । মোঘল ও ব্রিটিশ শাসনকালেও এই অঞ্চলে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা বজায় রেখেছিল। কর্পাস তুলা নজরানা হিসেবে দেওয়া হলেও পাহাড়ীরাই শাসনকার্যে নেতৃত্ব দিয়েছিল। 

১৭৭৬ সালে চাকমারা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যা এ অঞ্চলে স্বাধীন চেতা ও স্বতন্ত্রবোধের প্রমাণ দেয়। পরবর্তীতে ১৯০০ সালে ব্রিটিশরা পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য চিটাগাং হিল ট্র্যাক রেগুলেশন অ্যাক্ট প্রণয়ন করে।  ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর এ অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে চাকমা মার্মা এবং ত্রিপুরা এছাড়াও তঞ্চঙ্গা লুসাই পাঙ্খ মুং খিয়াং বোম খুমি চাক সহ আরো অনেক ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী এই অঞ্চলে বাস করে। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে যা এই অঞ্চলের বৈচিত্রকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। চাকমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত তাদের উৎপত্তি নিয়ে দুটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে, একটি তত্ত্ব মতে তারা মায়ানমার ও আরাকান অঞ্চলের আদিবাসী ছিল আরেকটির মতে তারা উত্তর ভারতের চম্পকনগর থেকে অভিবাষী হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে। 

১৬০০ শতকে চাকমারা আরাকান থেকে উত্তর দিকে চট্টগ্রামে এসে বাংলার নবাবের অনুমতিতে বসতি স্থাপন করে। মারমারা ১৭০০ শতকে মায়ানমার থেকে আসে এবং ত্রিপুরারা প্রায় ৬৫ খ্রিস্টাব্দে আসাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন।  ১৯৬০ সালে কর্ণফূলী নদীর উপর কাপতাই বাঁধ নির্মাণ করা হয় যা বাংলাদেশের প্রথম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে পরিচিত। এই বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ৬৫৫ কি.মি. এলাকা প্লাবিত হয় যার মধ্যে ২২০০০ একর চাষযোগ্য জমি ছিল। এতে প্রায় ১৮০০০ পরিবার জমি ও ঘরবাড়ি হারায় যার অধিকাংশই ছিল চাকমা জনগোষ্ঠী। বাস্তুচ্যুতির ফলে প্রায় ১ লক্ষ আদিবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের অনেকেই ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কাপত্তাই বাধ নির্মাণের ফলে আদিবাসীদের চাষাবাদ বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ ব্যাহত হয় এবং তাদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। এ ঘটনায় আদিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং ক্ষোভের জন্ম নেয় যা পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জটিল করে তোলে।  

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অংশ হয় তবে এসময় চাকমা রাজা ত্রিদ্বীপ রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় আদিবাসীরা তাদের সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র হারানোর সংকা করে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আদিবাসীদের বাঙালি পরিচয় নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে অঙ্গীভূত হতে আহ্ববান জানান। কিন্তু চাকমা নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লার্মা আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্বায়ত্ব শাসনের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পিসিজে এসএস সংগঠন করেন।  ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনা মোতায়ন বাড়ানো হয় এবং বাঙালি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি সেটলারদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় যা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্ত সৃষ্টি করে। শান্তিবাহিনী গঠন করে পাহাড়ীরা সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান ছিল। সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে রূপ নেয়ার সংঘাতে ১৯৮০ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যেই শান্তিবাহিনী ১১৮০ জনকে হত্যা করে এবং অপহরণ করে ৫৮২ জন।  

১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ও পিসিজে এসএস এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ীদের জন্য আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, ভূমি মালিকানার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া এবং সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার সহ বেশ কয়েকটি মৌলিক বিষয় সমযোতা হয়। তবে, চুক্তির পরেও অনেক ধারা বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ থেকে গেছে। বাঙালিরা অভিযোগ করে যে, শান্তি চুক্তির ফলে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে পরিণত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও উপদল সক্রিয় শান্তিবাহিনী থেকে ভেঙে সৃষ্টি হয়েছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ যা শান্তি চুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে এবং সশস্ত্র বিদ্রোহ অব্যাহত রেখেছে । এছাড়া জনসংহতি সমিতির মধ্যেও বিভাজন দেখা দিয়েছে যার মধ্যে রয়েছে সন্তু লার্মা গ্রুপ এবং এম এন লার্মা গ্রুপ। বিভিন্ন দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ, ভূমি নিয়ে বিরোধ এবং স্বায়ত্ব শাসনের ধরণ নিয়ে মতভেদ পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতাকে অব্যাহত রেখেছে।  পাহাড়ী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত এবং দখলদারিত্বের বিষয়গুলো এখনো সমাধানহীন অবস্থায় রয়েছে। শোনা যায় পার্বত্য এলাকাগুলোতে সত্যিই আদিবাসীরা অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাহলে কি সত্যিই সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তারা এসব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? মুদ্রার একপিঠ যখন বলেছি অন্য পিঠটা না বলে আর থাকি কিভাবে। অনেকেই বিভিন্ন সময় বলে থাকেন পার্বত্য এলাকাগুলো মাদক চোরাচালানের প্রধান রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয় আর মাদকের সাথে সাথে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র যা অস্ত্রধারীরা সেখানে চালায় তান্ডব। আর এই অবস্থায় সেনাবাহিনী যদি পার্বত্য এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়া হয় তাহলে বাংলাদেশী হিসেবে নিজের দেশেরই একটি জেলা চট্টগ্রামে আর আপনারা যেতে পারবেন? কি মনে হয়?

মুদ্রার দুই পিঠেই যে কথাগুলো বললাম সেগুলোর সবই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ানো নানা রকম কনস্পিরেসি থিওরি এগুলোর সত্য হতে পারে আবার নাও হতে পারে। এই অবস্থায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছু ছবি ও ভিডিও যা দেখে রীতিমত অবাক সাধারণ মানুষ। যেখানে দেখা আদিবাসী সশস্ত্র দলগুলোর হাতে দেখা যাচ্ছে আধুনিক সব মরণাশ্র। অনেকে বলছেন ছবিগুলো অন্য দেশের সেটার সত্যতা সবসময় যাচাই করা না গেলেও কিছু সত্যি ভিডিও তো গণমাধ্যমে দেখানো হয়েছে। যেখানে আদিবাসীরা বলছেন “এখানে পাহাড় থেকে সেনাশাসন তুলে নাও এরপরে বাঙালিদের তুলে নাও।  আমাদের পাহাড় লাগবে। আমাদের চিএইছটি, চিএইছটি চট্টগ্রাম আমাদের! আরো পাবেন না চিএইছটি! চিএইছটি আমাদের আমাদের হতে হবে”। এই ভিডিওটা দেখার পর নিশ্চয়ই আপনাদের বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় কারা এই ধরনের ইন্ধনের পিছনে কলকাঠি নাড়ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূখণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে রয়েছে দেশের বৃহত্তম বনাঞ্চল এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর চট্টগ্রামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ চট্টগ্রামের নদীগুলো পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়। মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা রয়েছে যা এই অঞ্চলকে ভূরাজনৈতিকভাবে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক মিল রয়েছে যা পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো জটিল করেছে।

ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর আধিপত্য বিস্তার করে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। চীনও এই অঞ্চলে কৌশলগত আগ্রহ দেখিয়েছে কারণ বঙ্গোপসাগরের তাদের প্রবেশাধিকার পেতে পার্বত্য চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা মূলত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্য শাসনের দাবি। বাঙালি সেটলারদের ভূমি অধিকার এবং নৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে সংঘর্ষকে ঘিরে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ভিন্ন মতাদর্শের কারণে এ অঞ্চলে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।  তবে একটা দেশের স্বাধীনতার পর থেকে সেই ভূখণ্ডে যারা বসবাস করেন তাদের সবাইকে সেই দেশের নাগরিক ধরা হয়। আদিবাসীরা  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান করেছেন তার মানে তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। একজন বাংলাদেশের নাগরিক যা সুযোগ সুবিধা পায় বা অধিকার ভোগ করে তার প্রত্যেকটা তাদের প্রাপ্য। তাহলে তাদের অধিকার পেতে কেন বছরের পর বছর ধরে আন্দোলন করতে হবে সংগ্রাম করে যেতে হবে? আর যদি তাদের এই অধিকার আদায়ের সংগ্রামের নামে কুচুক্রী মহলের স্বার্থ হাসিলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায় তাহলে আমরা আশা করব খুব শীঘ্রই তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বাংলাদেশের সবাই এক হয়ে নতুন এক বাংলাদেশের পথ সুগম করবে।

-আকাইদ আরিফুল

লেখাটির Pdf সংগ্রহ করুন এখান থেকে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ